ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক জটিল ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। একদিকে তিনি দ্রুত ‘বিজয়’ ঘোষণা করতে চাইছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাত থেকে ফসকে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে যুদ্ধ থেকে সরে আসা বা এতে জড়িয়ে থাকা—উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের ১৪তম দিনে এসে ট্রাম্প প্রশাসনের কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন কঠিন হয়ে পড়ার পেছনে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রথমত,হরমুজ প্রণালির সামরিক ধাঁধা।বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান প্রণালিটি কার্যত অচল করে দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান বলেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করা না গেলে এটিকে কোনোভাবেই বিজয় বলা যাবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত,ইরানের নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে কৌশল নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন, তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির দায়িত্ব গ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তৃতীয়ত,ইসরায়েলের নিজস্ব কৌশল।যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী হলেও মিত্র দেশ ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইরানের তেল অবকাঠামোতে ইসরায়েলের হামলা ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিয়েছে।
চতুর্থত,যুদ্ধের অসংলগ্ন বর্ণনা। হোয়াইট হাউস শুরু থেকেই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক কোনো কৌশলগত বর্ণনা না থাকায় রাজনৈতিকভাবে বিজয় দাবি করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
পঞ্চমত,ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের দাবি করলেও জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ইসফাহান কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে।
ষষ্ঠত,ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি।যুদ্ধের শুরুতে ইরানি জনগণকে বিদ্রোহে উসকে দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং হামলা থামলে শাসনব্যবস্থা আরও কঠোর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবশেষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে, যা মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি বা জাপানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে ধরনের স্পষ্ট বিজয় এসেছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বরং ট্রাম্প প্রশাসন একটি ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধের’ ফাঁদে আটকে গেছে। দ্রুত কৌশলগত সমাধান না হলে দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ ইরানের প্রতিরোধই যুক্তরাষ্ট্রকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
