দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঐতিহাসিক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এক দশকের অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি ধাপ অতিক্রমের পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য মিলেছে ‘কমিশনিং লাইসেন্স’। এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আজ (২৮ এপ্রিল) পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ইউরেনিয়াম লোডিং। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে যাত্রা শুরু করবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর কঠোর তদারকি এবং সব নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হবে, যা দেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী জুলাই বা আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এই ইউনিট থেকে উৎপাদিত হবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ফুয়েল লোডিংয়ের সময়সূচি একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রকল্প উদ্বোধনের সময় ২০২২ সালে উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও তা সংশোধন করে ২০২৬ সালের মধ্যভাগে আংশিক উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, “জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যা একটি বড় অর্জন।”
নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের মতে, “আন্তর্জাতিক প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময় লাগলেও সেটিই প্রকল্পের সাফল্যের চাবিকাঠি।”
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই প্রকল্পটি কমিশনিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বর্তমানে ৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ অপারেটিং লাইসেন্স পেয়েছেন। প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার রুশ ও ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন এবং ধাপে ধাপে পরিচালনার দায়িত্ব দেশীয় জনবলের হাতে হস্তান্তর করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
