একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং—এমন পরিস্থিতিতে কুমিল্লার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিন-রাত সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা ও চলতি বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রমেও।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ। গভীর রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ।
শহরতলির দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সাতবার লোডশেডিং হয়েছে, যার মধ্যে একবার টানা তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এতে শিশুদের নিয়ে চরম কষ্টে আছেন তারা।
মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা অহিদুর রহমান বলেন, “আমরা দিনে গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই, বাকি সময় লোডশেডিং থাকে। দুর্ভোগের শেষ নেই।”
অপরদিকে,বুড়িচং উপজেলার বাকশীমূল গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়া আক্তার অন্তর বলেন,প্রতিদিন দিনে-রাতে ৫-৬ বার বিদ্যুৎ থাকে না। আমাদের ঘরে বয়স্ক শশুর -শাশুড়ী অসুস্থ আছে এবং শিশু সন্তানও রয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে তারা গরমে অনেক কষ্ট পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। কুমিল্লা জোনে মোট চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
তবে কুমিল্লা শহরে তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম। কারণ, শহরে ভারতের ত্রিপুরা গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শহরে ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৮০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর তথ্যমতে, বিভিন্ন উপজেলায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও তা ১০ ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
চলমান বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বোরো ধানের মৌসুমে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ফলন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেবীদ্বার উপজেলার কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, “ধানের শিষ বের হয়েছে, এখন নিয়মিত পানি দরকার। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় জমিতে পানি দিতে পারছি না।”
একইভাবে শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিসিক শিল্পনগরী ও ইপিজেডের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকরা জানান, ৮ ঘণ্টার কাজ করতে এখন ১১–১২ ঘণ্টা সময় লাগছে।
কারখানা মালিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালানোর মতো জ্বালানি তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
কুমিল্লা বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় ১৪১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা।
