রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর অন্তত সাত থেকে আট দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি নগরজীবনের একাকীত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবীণদের প্রতি অবহেলার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
রোববার (১ জুন) রাতে ফ্ল্যাট থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ ফোন করা হয়। পরে পল্লবী থানা পুলিশ মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের একটি ফ্ল্যাটের কক্ষ থেকে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে একেএম আনিসুর রহমান একজন যুগ্ম সচিব, কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, কে এম আতিকুর রহমান কানাডাপ্রবাসী এবং মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা একজন স্কুলশিক্ষক। মেয়ের স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে মারা যান।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, নুরজাহান বেগম মেয়ের বাসাতেই থাকতেন। তবে তাকে একটি আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। ঘরের ভেতরের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় মরদেহে পচন ধরেছিল। কক্ষটি ছিল অপরিচ্ছন্ন, অগোছালো ও আবর্জনায় ভরা। এসব দেখে মনে হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মৃত্যুর সময় বা কারণ সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
ওসি জানান, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও ছিল সীমিত। এক পর্যায়ে একজন ছেলের কাছে বড় ভাইয়ের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি একটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিটিসেল নম্বর দেন। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক ও অপরাধ বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একজন মায়ের মৃত্যুর পর দিনের পর দিন মরদেহ পড়ে থাকা শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সমাজের নৈতিক ও মানবিক সংকটের প্রতিফলন।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা গৃহবধূ সোহরা আক্তার বলেন, ‘একজন মা সন্তানকে বড় করতে জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করেন। সেই মায়ের মৃত্যুর পর যদি তার মরদেহ দিনের পর দিন পড়ে থাকে, তাহলে তা সমাজের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়।’
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা (সাবেক সচিব) আলহাজ্ব মুহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘বাবা-মায়ের দায়িত্ব সন্তানকে মানুষ করা, আর সন্তানের দায়িত্ব বাবা-মায়ের দেখভাল করা। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কারণে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
তিনি বলেন, সরকার প্রবীণদের সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেও পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই।
মিরপুরের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—শিক্ষা, পদমর্যাদা কিংবা আর্থিক সফলতা সবসময় মানবিক দায়িত্ববোধের নিশ্চয়তা দেয় না। প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক যত্ন, সামাজিক সচেতনতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ জোরদার না হলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
