চাকরি পাওয়ার ৭ মাস পরই স্বামীকে তালাক, স্ত্রীর পেছনে খরচের টাকা ফেরত চান প্রবাসী
স্বামীর উপার্জিত অর্থে পড়াশোনা ও ঢাকায় প্রায় চার বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পর চাকরি পাওয়ার সাত মাসের মাথায় স্ত্রী তাকে তালাক দিয়েছেন—এমন অভিযোগ করেছেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী সাইফুল ইসলাম (খোকন)। একই সঙ্গে স্ত্রীর কাছে গচ্ছিত অর্থ ফেরত এবং অভিযোগের তদন্ত করে ন্যায়সংগত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার রায়শ্রী উত্তর ইউনিয়নের উনকিলা গ্রামের। সাইফুলের অভিযোগের বিষয়ে তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে সাইফুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় চার মাস পর সাইফুল কর্মস্থল মালয়েশিয়ায় ফিরে যান। এরপর কয়েক বছর পর পর দেশে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের সংসার চলছিল।
সাইফুলের দাবি, একপর্যায়ে স্ত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি এতে সম্মতি দেন। তার অর্থায়নেই জান্নাতুলকে হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি করানো হয়। পরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় কোচিং করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাতেও তিনি সম্মতি দেন।
সাইফুল বলেন, সরকারি চাকরি পেলে তাকে আর বিদেশে থাকতে হবে না—স্ত্রীর এমন আশ্বাসে তিনি তার পড়াশোনা, কোচিং, ঢাকায় বাসাভাড়া, থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন। এভাবে প্রায় চার বছর চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পর জান্নাত তাকে সরকারি চাকরি পাওয়ার খবর দেন।
সাইফুলের ভাষ্য, জান্নাত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে চাকরি পাওয়ার কথা জানান। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী সমিতির মাধ্যমে জমি বা প্লট কেনার জন্য এককালীন ও মাসিক কিস্তিতে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাকে জানান। এ সময় স্বামী ও নমিনি উল্লেখ করে ছবিসংবলিত একটি পূরণ করা আবেদনপত্রের কপিও তাকে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন সাইফুল।
চাকরি পাওয়ার খবর পেয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন সাইফুল। তবে স্ত্রীকে বিষয়টি জানালে তাকে আরও কয়েক বছর বিদেশে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে তার দাবি। একই সঙ্গে দেশে ফেরার সময় সোনার নেকলেস, চুড়িসহ বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসার জন্য স্ত্রী আবদার করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
এরই মধ্যে জান্নাতের ছোট বোন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় তার বাসায় অবস্থান করেন। পরে ওই বোনের কাছ থেকে স্ত্রীর বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন সাইফুল। গত জুলাই মাসে স্ত্রীকে না জানিয়ে বাংলাদেশে ফিরে তিনি সরাসরি ঢাকায় যান।
সাইফুলের অভিযোগ, ঢাকায় পৌঁছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সামনে থেকে স্ত্রীকে ফোন করেন তিনি। জান্নাত সেখানে এসে কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর অফিসের ব্যস্ততার কথা বলে তাকে বাইরে রেখে ভেতরে চলে যান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি।
পরে স্ত্রীর বাসায় গিয়ে সাইফুল জানতে পারেন, কয়েক দিন আগেই জান্নাত ওই বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। পরদিন আবার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে স্ত্রীর বিষয়ে খোঁজ নিতে চাইলে পদবি ও সুনির্দিষ্ট পরিচয় দিতে না পারায় তারা কোনো সহযোগিতা করতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর গ্রামের বাড়িতে ফিরে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাইফুল। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান তিনি। একপর্যায়ে ডাকযোগে স্ত্রীর পাঠানো তালাকের নোটিশ পান।
সাইফুল বলেন, দীর্ঘদিন স্ত্রীর পড়াশোনা, কোচিং, ঢাকায় থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন খরচ বহন করার পর তিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। পাওনা অর্থসহ বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে তিনি আদালতে মামলা করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্ত করে ন্যায়সংগত সমাধানের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের বক্তব্য জানতে তাদের বাড়িতে গেলে তার বাবা মো. আনোয়ার হোসেনকে পাওয়া যায়নি। তার মা সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে আড়ালে চলে যান। তবে ছোট ভাই ফয়সাল তালাকের নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ফয়সাল বলেন, তার বোন জানিয়েছেন, সাইফুল বিদেশে থাকাকালে তার ঠিকমতো খোঁজখবর রাখতেন না। এ কারণে তিনি তাকে তালাক দিয়েছেন। তবে বোনের পড়াশোনা, কোচিং, ঢাকায় বাসাভাড়া এবং থাকা-খাওয়ার খরচ দুলাভাই সাইফুলই বহন করেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।
এ বিষয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তালাকের কারণ ও সাইফুলের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
