নব্বইয়ের সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া;আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়’র বিশেষ কলাম
নব্বইয়ের দশকে আমিও যেন ফিরে গেলাম। যদিও বাস্তবে ছবির মতো সেই সময়ের বড় মানুষ আমি ছিলাম না,তখন আমি ছিলাম ছোট্ট এক শিশু। তবুও শৈশবের কিছু স্মৃতি আজও মনের কোণে অমলিন হয়ে আছে। সময়ের স্রোতে কত কিছু বদলে গেছে, কিন্তু সেই দিনগুলোর সরল আনন্দ, নির্মলতা আর মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তরিক যোগাযোগ আজও মনে এক অন্যরকম আলো জ্বালায়।
সেই সময়ের পাড়ার জীবন ছিল অন্যরকম। বন্ধুদের সঙ্গে কড়ি খেলা, মার্বেল, গোল্লাছুট কী যে আনন্দ ছিল! খেলাধুলার জন্য দামি কোনো সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। একটু খোলা জায়গা, কয়েকজন বন্ধু আর অফুরন্ত সময়, এতেই যেন পুরো পৃথিবীটা আমাদের হয়ে যেত।
কেরাম বোর্ডের কথাই বা কীভাবে ভুলে যাই! আঙুলের টোকা বা ফ্লিক দিয়ে স্ট্রাইকার চালিয়ে ঘুঁটিগুলো একের পর এক পকেটে ফেলতে পারলেই মনে হতো বিরাট কোনো বিজয় অর্জন করেছি। সামান্য সেই আনন্দই তখন ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি।
পাড়ার মাঠে ঘুরে বেড়ানোর মজাটাও ছিল আলাদা। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য ছিল না, তবুও বিকেল নামলেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। কখনো মাঠে, কখনো গলির মোড়ে, কখনো কারও বাড়ির উঠানে,এভাবেই কেটে যেত সময়।
মনে পড়ে হায়দার আলী দাদার মাটির ঘরের সামনে উঠানে দাঁড়িয়ে সাদাকালো টেলিভিশনে বিটিভির অনুষ্ঠান দেখার কথা।সাপ্তাহিক ছবি, নাটক কিংবা ‘আলিফ লায়লা’ এসব দেখার জন্য যেন পুরো পাড়ার মানুষের মধ্যে আলাদা এক আগ্রহ তৈরি হতো। তখনকার সেই সাদাকালো পর্দাটিও আমাদের কাছে ছিল এক বিস্ময়ের জানালা।
ক্যাসেট প্লেয়ার আর রেডিও ছিল বিনোদনের অন্যতম সঙ্গী। প্রিয় গান শোনার জন্য ক্যাসেটের ফিতা ঘুরত, রেডিওর নব ঘুরিয়ে পছন্দের অনুষ্ঠান বা গান খোঁজা হতো। আজকের মতো এক ক্লিকেই হাজারো গান কিংবা ভিডিও হাতের মুঠোয় চলে আসত না। অপেক্ষার মধ্যেও ছিল আনন্দ, আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। আর সবচেয়ে বড় কথা তখন মানুষ মানুষের কাছাকাছি ছিল।
স্ক্রিনের আড়ালে নয়, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়া, গল্প করা, হাসাহাসি করা এবং নিখাদ যোগাযোগ রাখার চেষ্টা ছিল আমাদের স্বাভাবিক জীবনের অংশ। কারও সঙ্গে কথা বলতে হলে তার বাড়িতে যেতে হতো, খোঁজ নিতে হলে সরাসরি দেখা করতে হতো। হয়তো প্রযুক্তি ছিল কম, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল অনেক বেশি।
পাড়ার গলি কিংবা রাস্তায় ঠেলাগাড়ি বা বাইসাইকেল নিয়ে আইসক্রিম বিক্রেতাদের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যও এখন কেবল স্মৃতি। তাদের ঘণ্টার সেই টুংটাং শব্দ ছিল শিশুদের কাছে যেন আনন্দের ডাক।
দূর থেকে সেই শব্দ কানে এলেই মন ছুটে যেত আইসক্রিমওয়ালার দিকে। তারপর মা-বাবার কাছে পয়সা বা টাকা চেয়ে কান্নাকাটি শেষ পর্যন্ত টাকা হাতে পেলেই আইসক্রিম কিনে খাওয়া। সেই আইসক্রিমের স্বাদ হয়তো আজকের দামী আইসক্রিমের চেয়েও বেশি মিষ্টি ছিল। কারণ তার সঙ্গে মিশে ছিল শৈশবের আনন্দ।
ভোরের স্মৃতিও কম নয়।খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার সঙ্গে মসজিদের মক্তবে যেতাম।হুজুরের সামনে বসে সবাই মিলে সুর মিলিয়ে কোরআনের সূরা মুখস্থ করতাম। ঘুমজড়ানো চোখ, মক্তবের পরিবেশ, সহপাঠীদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়া,সব মিলিয়ে সেই সকালগুলোও আজ মনে পড়ে অন্যরকম মায়া নিয়ে।
সময় বদলেছে। প্রযুক্তি পৃথিবীকে অভাবনীয় গতিতে এগিয়ে দিয়েছে। এখন পৃথিবী হাতের মুঠোয়। যোগাযোগ মুহূর্তের, বিনোদন সীমাহীন, তথ্যের ভাণ্ডার অসীম। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষ যেন কোথাও কোথাও হারিয়ে ফেলছে সেই সহজ-সরল জীবনটাকে, যেখানে আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হতো না।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিগতভাবে যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে নতুন নতুন সংকট। যুদ্ধ, সংঘাত, অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থান পৃথিবীকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কখনো কখনো মনে হয়, আমরা কি ধীরে ধীরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
কে জানে ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে আমাদের জন্য!২০৫০ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকা কিংবা পৃথিবীটাকে সেই সময় পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য আমাদের হবে কি না,তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
তবু মনের ভেতর একটা প্রশ্ন থেকেই যায় প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর পৃথিবী কি আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া নির্মল আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারবে?
সম্ভবত পারবে না।কারণ কড়ির খেলা, মার্বেলের টুংটাং শব্দ, গোল্লাছুটের দৌড়, কেরাম বোর্ডে স্ট্রাইকারের ফ্লিক, বিটিভির সাদাকালো পর্দা, ক্যাসেট প্লেয়ারের গান, আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টা কিংবা মক্তবের সুরে সুর মিলিয়ে সূরা মুখস্থ করার যে আনন্দ—সেটি কোনো আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা যায় না।
সেসব আনন্দ একবারই আসে।শৈশবের হাত ধরে আসে, সময়ের সঙ্গে চলে যায়,আর ফিরে আসে শুধু স্মৃতি হয়ে।হায়, সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে আসত!
তাহলে হয়তো আবার কোনো এক বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ছুটতাম, গলির মোড়ে আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টার শব্দ শুনে মায়ের কাছে টাকা চাইতাম, আর সন্ধ্যায় হায়দার আলী দাদার মাটির ঘরের উঠানে দাঁড়িয়ে সাদাকালো টেলিভিশনের পর্দায় হারিয়ে যেতাম।
কিন্তু সময় তো আর পেছনে হাঁটে না।তাই আজ শুধু মনে মনে ফিরে যাই আমার সেই নব্বইয়ের শৈশবে!তবে আমি ভাগ্যবান কারণ, নব্বইয়ের যুগ এবং আধুনিক যুগ আমি দেখতে পেরেছি। আল্লাহ দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।
আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়
গীতিকবি ও সাংবাদিক
