কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার অধিকাংশ কৃষক বোরো ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই ভালো ফলনের আশায় বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেন তারা। কিন্তু মৌসুম শেষে সেই স্বপ্নই এখন ভেঙে যাচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি ও তীব্র শ্রমিক সংকটে।
উপজেলার পয়াতের জলাসহ বিভিন্ন মাঠে পাকা সোনালি ধান বৃষ্টির পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও ধান কাটা যাচ্ছে না শ্রমিকের অভাবে, আবার কোথাও কেটে ঘরে তুললেও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে ধান। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার খাড়াতাইয়া নতুন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে হাতে কাস্তে ও লাঠি নিয়ে শতাধিক শ্রমিক কাজের আশায় অপেক্ষা করছেন। উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও ময়মনসিংহ থেকে আসা এসব শ্রমিকের অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। জীবিকার তাগিদেই তারা ধান কাটার কাজে এসেছেন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব শ্রমিক জমির উদ্দিন বলেন,শরীরে মাংস নাই, শুধু হাড্ডি। পেটের দায়ে আইছি। ১৪০০ টাকার কমে কামে যামু না। জমিতে হাঁটু পানি-কাঁদা থাকলে ১৮০০ টাকা দেওয়া লাগব।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল হামিদ জানান, বর্তমানে এক মণ মোটা ধানের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। অর্থাৎ একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি দিতে দুই মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে তিন বেলা খাবার, নাশতা ও বিড়ি-সিগারেটের অতিরিক্ত খরচ।
আরেক কৃষক মনির হোসেন বলেন,গত বছর ৯০০-১০০০ টাকায় শ্রমিক পাইছিলাম। এবার খরচ প্রায় দ্বিগুণ। ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।
শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তারা বাধ্য হয়েই বেশি মজুরি দাবি করছেন। উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে জনপ্রতি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা গাড়িভাড়া গুনতে হয়। পাশাপাশি কাঁদা ও পানিতে কাজ করাও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
ময়মনসিংহ থেকে আসা শ্রমিক কামাল বলেন,বউ মারা গেছে। তিনটা পোলাপান। হাড্ডিসার শরীর নিয়া আইছি। ১৮০০ টাকা না হইলে পোলাপান কী খাইব?
এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কারণে উপজেলার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় নিচু জমির পাকা ধান ডুবে যাচ্ছে। এতে কৃষকের লোকসানের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন,কৃষি শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও ভর্তুকির মাধ্যমে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিচু ও কাঁদাযুক্ত জমিতে চালানো যায়—এমন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা প্রয়োজন। তাহলে শ্রমিক সংকট অনেকটাই কমবে।
