আজ আমরা এমন এক অদ্ভুত সময় অতিক্রম করছি, যেখানে মানুষ বাহ্যিক উন্নয়নের গল্পে বিভোর হলেও ভিতরে ভিতরে সমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শহরের পর শহর উঁচু দালানে ভরে যাচ্ছে, প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মন ও মানসিকতা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে? এই প্রশ্ন আজ জাতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ একটি জাতির পতন কখনো হঠাৎ করে ঘটে না। ধীরে ধীরে মানুষের নৈতিকতা ধ্বংস হয়, বিবেক হারিয়ে যায়, সত্যের মূল্য কমে যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেমে যায়—আর তখনই একটি সমাজ ভিতর থেকে পচতে শুরু করে। আজ আমাদের সমাজে সেই ভয়াবহ বাস্তবতাই দৃশ্যমান।
বর্তমান সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষ এখন আর নিজেকে উন্নত করার জন্য প্রতিযোগিতা করে না; বরং অন্যকে নিচে নামানোর জন্য লড়াই করে। কেউ ভালো কিছু করলে তাকে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে তাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। একজন মানুষের সফলতায় অনুপ্রাণিত হওয়ার বদলে ঈর্ষা জন্ম নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায় কৃত্রিম জীবন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। বাস্তবতার চেয়ে অভিনয় বেশি, মানবিকতার চেয়ে জনপ্রিয়তার লড়াই বেশি।
আজ মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করছে না। ব্যবসায় প্রতারণা, শিক্ষায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, চাকরিতে দুর্নীতি, রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার—সবকিছুর মূলেই রয়েছে অসুস্থ মানসিকতা।
আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে সততা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়, আর অসৎ উপায়ে সফল হওয়াকে চালাকির পরিচয় মনে করা হয়। এই ভয়াবহ চিন্তাধারাই আজ জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একসময় পরিবার ছিল নৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিখত মানবিকতা, সহানুভূতি, সম্মানবোধ ও আদর্শ। কিন্তু আজ ব্যস্ততার এই যুগে অনেক পরিবারেই সন্তানরা মানবিক শিক্ষার চেয়ে ভোগবাদী চিন্তাধারায় বড় হচ্ছে। ফলে তারা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতা শিখছে, কিন্তু সহমর্মিতা শিখছে না; জিততে শিখছে, কিন্তু মানুষ হতে শিখছে না।
আজ সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। মানুষ অল্পতেই রাগান্বিত হয়ে উঠছে। সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে হত্যা, সংঘর্ষ, প্রতিশোধ ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। সামাজিক অবক্ষয় এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মানুষ এখন নিজের স্বার্থের জন্য আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব এমনকি মানবতাকেও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। এটি শুধু একটি সামাজিক সংকট নয়; এটি একটি ভয়াবহ মানসিক সংকট।
আমরা প্রায়ই দেশ পরিবর্তনের কথা বলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় বড় বক্তব্য দেই, অন্যের সমালোচনা করি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু আমরা কি কখনো নিজের দিকে তাকাই? আমরা কি নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কতটুকু সৎ? আমি কতটুকু মানবিক? আমি কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই? আমি কি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি?
বাস্তবতা হলো, ব্যক্তি পরিবর্তন ছাড়া সমাজ পরিবর্তন অসম্ভব। কারণ সমাজ গঠিত হয় মানুষ দিয়ে, আর মানুষ যদি নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সমাজ কখনো সুস্থ হতে পারে না। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, একজন অসৎ ব্যবসায়ী, একজন দায়িত্বহীন শিক্ষক, একজন মিথ্যাবাদী নেতা—এরা সবাই সমাজের ভেতরে ধ্বংসের বীজ বপন করে। আবার একজন সৎ মানুষ, একজন মানবিক শিক্ষক, একজন আদর্শ সাংবাদিক, একজন ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক—তারা সমাজকে আলোর পথে নিয়ে যেতে পারেন।
বিশেষ করে আজকের তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা এমন এক সমাজে বড় হচ্ছে, যেখানে দ্রুত সফল হওয়ার চাপ তাদের নৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অল্প বয়সে বিলাসী জীবন, কৃত্রিম জনপ্রিয়তা ও অর্থের মোহ তাদের অনেককে ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের চিন্তা-চেতনার উপর। তাই এখনই প্রয়োজন তরুণদের মাঝে নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা।
সাংবাদিকতা, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এখন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন। শুধু আইন করে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কারণ আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেক জাগ্রত করতে পারে না। আর বিবেকহীন মানুষ কখনো প্রকৃত উন্নয়ন আনতে পারে না।
আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক বিপ্লব। এমন একটি পরিবর্তন, যেখানে মানুষ অন্যের ক্ষতিতে আনন্দ পাবে না; যেখানে প্রতারণা নয়, সততা হবে সম্মানের বিষয়; যেখানে ক্ষমতা নয়, ন্যায়বিচার হবে সবচেয়ে বড় শক্তি; যেখানে অর্থ নয়, মানুষ হওয়াটাই হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমরা যদি সত্যিই দেশকে বদলাতে চাই, তাহলে আগে আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করতে হবে নৈতিক শিক্ষার চর্চা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে জীবনের অংশ করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিতে হবে। সমাজে ভালো কাজের মূল্যায়ন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে কখনো সুস্থ সমাজ গঠন করা যায় না। একটি সুন্দর দেশ গড়তে হলে প্রয়োজন সুন্দর মন, সুস্থ চিন্তা ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। কারণ জাতির প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে, বিবেক থেকে, মানবিকতা থেকে।
আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। সময় এসেছে নিজেকে পরিবর্তনের। কারণ ব্যক্তি বদলালে পরিবার বদলাবে, পরিবার বদলালে সমাজ বদলাবে, আর সমাজ বদলালেই বদলে যাবে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
অতএব, আসুন আমরা হিংসা নয় ভালোবাসা, প্রতারণা নয় সততা, স্বার্থপরতা নয় মানবিকতা, আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয় সুস্থ মূল্যবোধের চর্চা করি। তাহলেই একদিন আমরা একটি সুন্দর, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
শাহজাহান বাশার,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
