Spread the love

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, কথিত ‘পুশব্যাক’, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়। তবে তখন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থান এবং পরবর্তীতে দলটির জয় নিশ্চিত হওয়ার পর।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর কলকাতার নিউমার্কেটসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা এবং বিজেপি নেতাদের বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দেশটিতে অবস্থানরত অবৈধ নাগরিকদের ‘পুশব্যাক’ বিষয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাওয়ার কথা বলেন। এরপর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথের আগের রাতেই বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বাড়ে।

‘উসকানিমূলক বক্তব্য সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর’

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, বিজেপি নেতাদের কিছু বক্তব্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন,“ভারত ও বাংলাদেশ দুটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। উসকানিমূলক বক্তব্য বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হলে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।”

তিনি আরও বলেন,“আমরা সংঘাত চাই না, সম্পর্কও খারাপ করতে চাই না। তবে বাংলাদেশের ওপর কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক সমস্যা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।”

সীমান্তে বাড়ছে শঙ্কাঃ

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশ ইস্যু বিজেপির অন্যতম প্রচারণার বিষয় ছিল। বিজেপি নেতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্তের উন্মুক্ত অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিএসএফ ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাবে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের “জনসংখ্যাগত পরিবর্তন” নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘সীমান্তে বিজিবিকে আরও সতর্ক থাকতে হবে’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. বায়োজিদ সরোয়ার বলেন,“নির্বাচনি প্রচারণার সময় এনআরসি, সিএএ এবং কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের পুশব্যাকের বিষয়গুলো নিয়ে বিজেপি নেতাদের বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে।”

তিনি বলেন,“পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত সবচেয়ে দীর্ঘ। ফলে এসব বক্তব্য সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ব্যাপক আকারে মুসলমানদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে পুশব্যাক করা হবে—এমন আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবুও সীমান্তে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”

কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে নতুন পরিকল্পনাঃ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,১৫৬.৫৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত ২,২১৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। বর্তমানে এর প্রায় ১,৬৪৭ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মিত হলেও বাকি প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ বলেন,“যেসব এলাকায় এখনো কাঁটাতারের বেড়া হয়নি, সেসব জায়গায় এবার ভারত আরও জোরালোভাবে বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করতে পারে। এমনকি ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে সীমান্তে কুমির ও সাপ ছাড়ার মতো চাঞ্চল্যকর বিষয়ও উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক নজর রাখতে হবে।”

তিনি আরও বলেন,“ভারতে অনেক মানুষকে ভোট দিতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বাংলাদেশি বলা হয়েছে। ফলে পুশব্যাকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।”

সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার আহ্বানঃ

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। সীমান্ত হত্যা, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে ইস্যু বানানো হলে তা দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সূত্রঃ যুগান্তর

By তালাশ বাংলা ডেস্ক

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়