কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে বহু বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার গুঞ্জন। স্থানীয়দের দাবি, বিদেশি কোম্পানি এসে খননকাজও চালিয়েছিল। পরে রহস্যজনকভাবে একটি হেলিকপ্টার এসে কূপ সিলগালা করে দেয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় পুরো এলাকায় কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাস্থল কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর এলাকার লালমাই পাহাড়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে তেল-গ্যাসের অস্তিত্ব নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ সালের দিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) লালমাই এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে ‘লালমাই-১’ ও ‘লালমাই-২’ নামে দুটি কূপ খনন করা হয়। প্রাথমিকভাবে কিছু পরিমাণ তেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও পরীক্ষামূলক উত্তোলনে উৎপাদন খুবই সীমিত ছিল।
সূত্র জানায়, লালমাই-১ কূপ থেকে দৈনিক মাত্র ২০ থেকে ২৫ ব্যারেল তেল উত্তোলন সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে লালমাই-২ কূপে চাপ কম থাকায় সেটিও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি তেলকূপকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে প্রতিদিন অন্তত কয়েকশ ব্যারেল তেল উত্তোলন প্রয়োজন হয়। সেই তুলনায় লালমাইয়ের উৎপাদন ছিল অত্যন্ত কম। এছাড়া তেলের সঙ্গে অতিরিক্ত পানি উঠে আসা, চাপ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে কূপগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ বা ‘প্লাগ অ্যান্ড অ্যাবানডন’ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখানে তেল-গ্যাস পাওয়া গিয়েছিল। আমরা নিজের চোখে দেখেছি। ২০০২ সালে বিদেশি কোম্পানি খনন করতে আসে। পরে তারা চলে যায়। হাজার-হাজার মিটার খনন করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একসময় হেলিকপ্টার এসে এটি সিলগালা করে দেয়।”
বড় ধর্মপুর এলাকার আরেক বাসিন্দা মো. শহীদ বলেন, “এ জায়গাটা আমাদের বাড়ির পাশে। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি এটা সিসা ঢালাই দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কেন বন্ধ করা হলো, কে করল—আজও জানি না। সরকার চাইলে আবার অনুসন্ধান করতে পারে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিত্যক্ত তেল বা গ্যাসকূপ খোলা অবস্থায় রেখে দিলে গ্যাস লিক, অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিমালা মেনে অলাভজনক কূপগুলো সিলগালা করা হয়।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার উপব্যবস্থাপক সৈকত মাহমুদ বলেন, “লালমাই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক তেলের মজুত পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান চালানো হলেও তা অলাভজনক হওয়ায় কূপগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বড় আকারের কোনো খনিজ তেলের মজুত আবিষ্কৃত হয়নি। দেশের প্রধান জ্বালানি নির্ভরতা এখনও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। সিলেটের হরিপুর ও মৌলভীবাজারের বরমচাল ছাড়া উল্লেখযোগ্য তেল উৎপাদনের ইতিহাসও সীমিত। ফলে দেশের অধিকাংশ জ্বালানি তেল এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
