Spread the love

কুমিল্লার গোমতী নদীতে অবৈধভাবে মাটি কাটার কারণে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ, সড়ক ও সেতু চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে নদীর পাড় ও চরাঞ্চল থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে নদীপাড়ের কৃষি ব্যবস্থা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গোমতী নদীর দুই পাশে দেদারছে মাটি কাটা চলছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শত শত ট্রাক নদীর বাঁধ দিয়েই মাটি বহন করছে। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই পাড়জুড়ে মাটি কাটার যেন মহোৎসব শুরু হয়েছে।  অভিযোগ রয়েছে প্রাশসনের লোকজন অভিযানে নামার আগাম তথ্য পৌঁছে যায় মাটি খেকোদের কাছে।

হুমকিতে হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদনঃ

গোমতী নদীর চর এলাকায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে বছরে আনুমানিক দেড় হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হয়। অথচ একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্বিঘ্নে এই চরের ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। ফলে নদীপাড়ের কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

দুই শতাধিক স্পটে সক্রিয় মাটি কাটা চক্রঃ

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গোমতী নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার এবং বাম তীরে ৩৪.৭৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ি থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত নদীর টিক্কারচর, সংরাইশ, জালুয়াপাড়া, অরণ্যপুর, চাঁন্দপুর ব্রিজ এলাকা, কাপ্তানবাজার, পালপাড়া, আলেখারচর, বাবুর বাজার, শিমাইলখাড়া, রামনগর,বুড়িচং পূর্বহুড়া, নানুয়ার বাজার, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকাসহ অন্তত দুই শতাধিক স্থানে মাটি কাটা চক্র সক্রিয়।শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টর ও ট্রাকে করে বাসাবাড়ি ভরাট, পুকুর খনন ও বৈধ-অবৈধ ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে নদীর বাঁধ ও এলাকার রাস্তাঘাট বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে।(২৬ জানুয়ারি ২০২৬)সোমবার রাত নয়টার দিকে টিক্করচর গোমতী নদী থেকে মাটি কাটার অভিযোগের সরেজমিনে সংবাদ সংগ্রহ করতে যায় কয়েকজন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা।তখন মোর্শেদ সিন্ডিকেটরা ওই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ছবি ও ভিডিও তোলার সময় বাধা প্রদান করে এবং প্রাণনাশের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসময় ছত্রখীল পুলিশ ফাঁড়ি ও কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনার মাশিয়াত আকতারকে অবগত করলে তিনি অভিযান পরিচালনা করার জন্য ঘটনাস্থলে  যায় এবং তিনি অভিযানে যাওয়ার আগেই মাটি খেকোরা আগাম তথ্য পেয়ে যায়। এসময় মাটি খেকোরা তাদের ট্রাক নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।তবে অভিযোগ রয়েছে মাটি খেকোদের সাথে অর্থ লেনদেনের  যোগাযোগ রাখছে প্রশাসনের কিছু অসাধু লোকজন এবং কথিত সাংবাদিকরা।

জোর করে ও নামমাত্র টাকায় জমির মাটি কাটার অভিযোগঃ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জমির মালিক অভিযোগ করে বলেন, সামান্য টাকা দিয়ে কিংবা জোর করে ভেকু ও ড্রেজার দিয়ে জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। করোনা মহামারির পর থেকে প্রশাসনের নজরদারি কমে যাওয়ায় মাটি কাটা সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

কৃষিতে ভয়াবহ প্রভাব, বাড়ছে সবজির দামঃ

কুমিল্লা খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আইয়ুব মাহমুদ বলেন,
“গোমতীর তীরে মাটি কেটে ফসলি জমি নষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, ধুলোবালিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। চরের জমি ধ্বংস হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।”স্থানীয় কৃষকেরা জানান, যেভাবে গভীর গর্ত করে মাটি তোলা হয়েছে, এসব জমিতে ভবিষ্যতে আর কখনো ফসল আবাদ সম্ভব নয়। বর্ষা মৌসুমে এসব গর্ত আশপাশের জমি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাঁধ মেরামতে ধীরগতি, দুর্ভোগে মানুষঃ

বুড়বুড়িয়া এলাকায় বন্যায় ভেঙে যাওয়া বাঁধটির মেরামত কাজ সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি। এতে সড়ক ব্যবহারকারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন,

“আমার ১২ শতক জমির মধ্যে এখন মাত্র ৩ শতক আছে। বাকি সব মাটি কেটে নিয়েছে। জমি না থাকায় চাষাবাদ করতে পারছি না।”রহমত আলী বলেন,“এভাবে মাটি কাটতে থাকলে অল্পদিনের মধ্যেই বাঁধ থাকবে না, ব্রিজ ভেঙে পড়বে। প্রশাসন এলেই কাজ বন্ধ থাকে, চলে গেলে আবার শুরু হয়।”স্থানীদের অভিযোগ গোমতী নদী থেকে মাটি কাটার ফলে বাঁধ দূর্বল হয়ে যায়,এতে করে বর্ষার সিজনের পাড়ের মানুষরা আতঙ্কে থাকতে হয়। ২৪ শে বন্যার সময় পাড়ের মানুষেরা অনেকটা আতঙ্কে থাকতে হয়েছে। এছাড়ও বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া নদীর বাঁধ ভাঙার ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল,পুকুর,ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইটভাটায় যাচ্ছে হাজার হাজার ট্রাক মাটিঃ

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার মালিকরাও এই অবৈধ মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত। প্রায় ৯০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিদিন ১৪শ থেকে ১৫শ ট্রাক মাটি কাটা হচ্ছে, যা জেলার বিভিন্ন বৈধ ও অবৈধ ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। একটি ইটভাটা একাই প্রতিদিন ৮০–৯০ ট্রাক মাটি নেয় বলে চালকেরা জানান।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন,“গোমতী নদীর পাড় থেকে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জড়িতদের অর্থদণ্ড দিচ্ছেন। গোমতী রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনার মাশিয়াত আকতার তালাশ বাংলাকে জানায়,আমি প্রায় সময় অভিযান পরিচালনা করি তবুও  মাটি ব্যবসায়ীরা গোমতী নদীতে তাদের তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযানে গেলে কাউকে পাওয়া যায়না তারা পালিয়ে যায়। আমি স্থানীয় সকলের সহযোগীতা কামনা করি।

By তালাশ বাংলা ডেস্ক

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *