চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গহিন পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাবের ডিএডি আব্দুল মোতালেব নিহত হওয়ার খবরে তার গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার অলিপুর গ্রামে চলছে হৃদয়বিদারক মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
প্রায় ২৮ বছরের কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে অবসর নিয়ে যে বাড়িতে পরিবারসহ শান্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন—সেই স্বপ্নের বাড়িটিই আজ দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ হয়ে। নিজের জমানো টাকায় একটু একটু করে নির্মাণ করছিলেন সেই বাড়ি। দু’দিন আগেও বাড়িতে এসে নির্মাণকাজ দেখে গিয়েছিলেন তিনি। কে জানত, সেটাই হবে শেষ দেখা।
আট ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট এবং আদরের ছিলেন আব্দুল মোতালেব। দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। পরিবারের জন্য, দেশের জন্য দায়িত্ব পালনে কখনো পিছপা হননি। বিজিবিতে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে র্যাবে যোগ দেন। সর্বশেষ দুই বছর ধরে র্যাবের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ডিএডি মোতালেবের ভাই জাকির হোসেন ভূঁইয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমাদের আট ভাইয়ের মধ্যে মোতালেব সবার ছোট। গত শনিবার সে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে এসেছিল। যাওয়ার সময় তার মেয়ে বলেছিল ‘বাবা, তুমি এখন যেও না।’মেয়ের কথা না শুনেই সে কাজে ফিরে যায়। আজ সে আর ফিরে এলো না।”
তিনি আরও বলেন,
“একজন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারও যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে? সরকারের কাছে অনুরোধ—যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মা যেন সন্তানহারা না হয়, কোনো শিশু যেন বাবাহারা না হয়।”
মেজো ভাই মজিবুর রহমান বলেন,
“আমার ভাই খুব ভালো মানুষ ছিল। সরকারি চাকরি করলেও সে সমাজের মানুষের সঙ্গে মিশে সামাজিক কাজ করত। আজ তাকে হারিয়ে আমরা দিশেহারা। তার ছেলেমেয়েরা এতিম হয়ে গেল।”
উল্লেখ্য, গতকাল ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন র্যাবের ডিএডি আব্দুল মোতালেব। এ ঘটনায় এক সোর্সসহ আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। আহতদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, জঙ্গল ছলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের অনুসারীরা এ হামলার নেতৃত্ব দেয়। ঘটনার পরপরই সন্ত্রাসীদের ধরতে ছিন্নমূল, আলীনগর ও লিংক রোড এলাকায় বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গল ছলিমপুরের ভেতরে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা এই সাহসী কর্মকর্তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়—শোকাহত গোটা জাতি। কর্তব্যের পথে জীবন দিয়ে গেলেন আব্দুল মোতালেব, রেখে গেলেন কান্না, শূন্যতা আর শেষ না হওয়া প্রশ্ন।
