অপরাধ তালাশ

অটোরিকশা ছিনতাইয়ে চালকদের টার্গেট, ‘সিরিয়াল কিলার’ মানিক গ্রেপ্তার

অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযোগে আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার স্বীকারোক্তি ও তদন্তে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জে অটোরিকশা চালক হত্যার দুটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। পুলিশ তাকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পুলিশ জানায়, গত ১২ আগস্ট নাঙ্গলকোট থানার আতিয়াবাড়ি এলাকায় একটি অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের পরিচয় মেলে অটোরিকশাচালক মো. মেহেদী (১৮) হিসেবে। এ ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানায় হত্যা মামলা হয়। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান, পিপিএমের নির্দেশে থানা পুলিশের পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা শাখা ছায়া তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক, শাহেদ, ফাহিম ও সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা মেহেদীকে হত্যা এবং তার অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কথা জানায়। পরে মানিক ও সেলিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্তের সময় মানিকের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। তবে ফোনটি তার নিজের ছিল না। অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, ফোনটি গত ২৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ অটোরিকশাচালক মো. আরমান হোসেনের (১৫)।

আরমান নিখোঁজের ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানায় প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি এবং পরে তার মামার করা অপহরণ মামলা তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে আরমানের চালানো অটোরিকশার কাটা বডি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মো. জোবায়ের হোসেন সুজন, নূর আলম ও মো. গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা অটোরিকশাটি আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক এবং সেলিমের কাছ থেকে পেয়েছেন। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এরই মধ্যে গত ১২ সেপ্টেম্বর মনোহরগঞ্জ থানার বিনয়ঘর এলাকায় একটি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মনোহরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা হয়। নিখোঁজ আরমানের মোবাইল ফোন, অটোরিকশা উদ্ধার এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পায় পুলিশ।

পরে আরমান অপহরণ মামলায় জেলহাজতে থাকা আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক এবং সেলিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, অপহরণের পর অটোরিকশাচালক আরমানকে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মনোহরগঞ্জের বিনয়ঘর এলাকার একটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক আরমানকে হত্যার কথা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

২০২৪ সালের আরেক হত্যার রহস্যও উদঘাটন

পুলিশের তদন্তে ২০২৪ সালের আরও একটি অটোরিকশাচালক হত্যার ঘটনাতেও মানিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শাহজাহান ওরফে সাইমন (১৭) নামে এক অটোরিকশাচালককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

হত্যার পর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে কাপড়ে পেঁচিয়ে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানাপ্রাচীরসংলগ্ন পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে ফেলে রাখা হয়। এ ঘটনায় লাকসাম থানায় হত্যা মামলা হয়। ওই মামলার তদন্তে আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি শাহজাহান ওরফে সাইমনকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক মূলত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করতেন। এরপর সুযোগ বুঝে অটোরিকশা ছিনতাই এবং চালককে হত্যার ঘটনা ঘটাতেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অটোরিকশাচালক হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানিককে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে অটোরিকশা ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।