Spread the love

কুমিল্লার দুঃখ-সুখের আধার হিসেবে পরিচিত গোমতী নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। গোমতী নদীর চরাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছেন কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন।

শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় তিনি এ কড়া বার্তা দেন।

দীর্ঘদিন ধরে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও চরাঞ্চলের উর্বর মাটি মাফিয়া চক্রের দখলে থাকায় স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে মন্ত্রী ইয়াছিন বলেন, “আজ থেকে গোমতীর এক ইঞ্চি মাটিও কাউকে কাটতে দেওয়া হবে না।”

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যারা এতদিন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বা প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে নদীর বুক খালি করেছে, তাদের দিন শেষ। পরিবেশ ও নদী রক্ষায় আমরা কোনো আপস করব না।”

মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা নজরদারি বাড়াতে হবে এবং নদী রক্ষায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবির সহ্য করা হবে না।

খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি;

কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী বলেন, মাটি কাটার নেতিবাচক প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপর নয়, সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়ছে। কৃষি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং মাটির উপরিভাগ (টপ সয়েল) কেটে নেওয়ার ফলে জমিতে ভারী ধাতুর মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।” এ সমস্যা সমাধানে সরকার একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা শিগগিরই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রশাসনকে রূপরেখা তৈরির নির্দেশঃ

সভায় কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান ও পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামানকে মন্ত্রীর নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে আগত মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রউফ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান নদীতীরবর্তী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। সভায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, “কেবল জরিমানা নয়, নদী ও মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা এবং প্রয়োজনে কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।”

বিশেষ প্রকল্প ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বঃ

মন্ত্রী গোমতীর চরাঞ্চল থেকে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং কৃষিজমিতে ভারী ধাতুর ঝুঁকি কমাতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের কথা জানান। তিনি মাটির উপরিভাগ সংরক্ষণ, জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয়দের মাঝেঃ

কুমিল্লার প্রাণ হিসেবে পরিচিত গোমতী নদী থেকে বছরের পর বছর অবৈধভাবে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়েছে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন বৃদ্ধি এবং বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কুমিল্লার সন্তান হিসেবে সমস্যাটির গভীরতা অনুধাবন করে মন্ত্রীর এ ঘোষণা স্থানীয় জনগণ ও নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “এক ইঞ্চি মাটিও কাটতে না দেওয়ার ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে গোমতী তার হারানো যৌবন ফিরে পেতে পারে এবং কুমিল্লার কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।”

এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কত দ্রুত মাটি খেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে গোমতীকে রক্ষা করতে পারে। কুমিল্লার ১০ লাখের বেশি কৃষক বাস্তবে এই ঘোষণার প্রতিফলন দেখতে অপেক্ষায় আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *