রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এমপি গাজী নজরুলের স্ত্রী মাকছুদা
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলাম এক দিনের রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক দিনের রিমান্ড শেষে মাকছুদা ইসলামকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।
আদালতে দেওয়া আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মামলাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালতে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।
মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগ
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ পেশায় মুদি দোকানি। তার ১৯ বছর বয়সী মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুন মাসে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম স্বামী গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকার ন্যাম ভবনের একটি বাসায় বসবাস করতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও সতীনের কাছ থেকে মরিয়ম বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। বিষয়টি তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম তাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি একটি কক্ষে মরিয়মকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে দরজা ভেঙে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে মরিয়মের বিছানা থেকে একটি চিরকুট উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম বলেন, মরিয়ম যে কক্ষে থাকতেন, সেখান থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে।
এজাহারে চিরকুটের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সেখানে লেখা ছিল—‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…।’ আরও লেখা ছিল, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম, তার সঙ্গে জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে।’
চিরকুটের আরেক অংশে লেখা ছিল—‘যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি, তুমি জিতেছ; কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছ।’
মরিয়মের বাবার অভিযোগ, তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। পরে স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং আসামিদের প্ররোচনার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।
আগেও আলোচনায় ছিলেন এমপি
চলতি বছরের জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে পাওয়া তথ্য তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রমে যাচাই করা হবে।
