Spread the love

পড়ার টেবিল ছেড়ে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে দেশের কিশোররা। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন শুধু ছিনতাই বা চুরিতেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা জড়িয়ে পড়ছে খুনোখুনির মতো নৃশংস অপরাধেও। তাদের হাতে উঠছে চাপাতি, পিস্তল ও রিভলবারসহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে পাড়া-মহল্লায় কোনো অপরাধ ঘটলেই সবার আগে উঠে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গত কয়েক বছরে এসব গ্যাং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন গ্রুপ গড়ে ওঠার পাশাপাশি পুরোনো গ্যাং সদস্যরা দল ও নেতৃত্ব বদলে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে ২৩৭টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১১৮টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি। কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহেও এদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিটি গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা ৭ থেকে ২০ জনের মধ্যে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ২০ মাসে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর গত ১৬ বছরে এ সংখ্যা শতাধিক।

সম্প্রতি কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাব জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়ে তিনি নিহত হন। একইভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একাধিক হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে এলেক্স ইমন নামে এক গ্যাং নেতাকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে হত্যা করে। মোবাইল ছিনতাইকে কেন্দ্র করে এলেক্স গ্রুপ ও আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল।

অন্যদিকে, শেরপুরের নকলায় তুচ্ছ ঘটনায় কিশোরদের ছুরিকাঘাতে সজীব মিয়া (১৪) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়, যা কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের মধ্যে মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব এসব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নিজেদের প্রভাব ও ‘হিরোইজম’ দেখাতে তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

রাজধানীর অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল ছবি ছড়ানো ও হ্যাকিংয়েও তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক গ্যাং সক্রিয়। কবজিকাটা, এলেক্স ইমন, পাটালি, ডায়মন্ড, বেলচা মনিরসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত এসব গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী আতঙ্কিত। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এসএন মো. নজরুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার ও অভিযানের পরও জামিনে বেরিয়ে অনেকেই আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক মদদ বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি তাদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথক শিশু আদালত এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে কিশোর অপরাধ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

By তালাশ বাংলা ডেস্ক

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়