অপরাধ তালাশ

কুমিল্লায় আত্মগোপন থেকে বাড়িতে এলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা

কুমিল্লার মুরাদনগরে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকা আনোয়ার হোসেন (৪৫) নামে এক যুবলীগ নেতাকে ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার স্ত্রী মোমেনা বেগমও আহত হন।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের পেন্নই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নিহত আনোয়ার হোসেন পেন্নই গ্রামের মৃত মনু মিয়ার ছেলে। তিনি শ্রীকাইল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি এবং একই ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি মুরাদনগর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আনোয়ার দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা।

পুলিশ জানায়, আনোয়ারের বিরুদ্ধে মারামারি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মুরাদনগর ও বাঙ্গরা থানায় অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুরাদনগর আসনে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচিত হওয়ার পরদিন আনোয়ার মেম্বার এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার বিরুদ্ধে মানুষের জমিতে অনুমতি ছাড়া ড্রেজার বসিয়ে মাটি বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয় বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সময় এসব বিরোধের জেরে আনোয়ারের বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি এলাকায় ফিরতে চাইলেও স্থানীয়দের বাধার কারণে ফিরতে পারেননি বলে সূত্রগুলো জানায়।

এ ছাড়া ২০২৩ সালে ড্রেজারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানের সময় মুরাদনগর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়িতে আনোয়ার ও তার সহযোগীরা হামলা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, শনিবার রাতে গোপনে গ্রামে ফিরে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন আনোয়ার। রাত ৩টার দিকে একদল লোক ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তারা আনোয়ারকে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। একপর্যায়ে তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে হামলাকারীরা মোমেনা বেগমকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে স্থানীয়রা আহত দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আনোয়ার হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগমের দাবি, সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ, কবির মুন্সী, জালাল ও পিন্টু তার স্বামীর কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

নিহতের জামাতা শফিকুল ইসলামও দাবি করেন, আনোয়ার হোসেন সাবেক সংসদ সদস্য ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার অভিযোগ, ভোররাতে জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারী সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ, কবির মুন্সী, জালাল ও পিন্টুর নেতৃত্বে সশস্ত্র লোকজন বাড়িতে ঢুকে আনোয়ারকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফিরোজ, কবির মুন্সী, জালাল ও পিন্টুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি সফিকুল ইসলাম বলেন, আনোয়ারের বিরুদ্ধে মারামারি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মুরাদনগর ও বাঙ্গরা থানায় অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে। রাত ৪টার দিকে আনোয়ার মেম্বারকে হত্যার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।