সারাদেশ

বিয়ের সাজানো বাড়িতে শোকের মাতম, বর সাজার আগেই চিরবিদায় সৌমিকের

গায়ে হলুদের রং মুছতে না মুছতেই নেমে এলো শোকের ছায়া। শুক্রবার বিয়ে, শনিবার বউভাত—সব আয়োজনই ছিল প্রস্তুত। কনেকে বরণ করতে সাজানো হয়েছিল আলোকসজ্জার গেট, দুই পরিবারেই চলছিল নতুন জীবন শুরুর আনন্দঘন প্রস্তুতি। কিন্তু বিয়ের আগের রাতেই নিভে গেল সেই আনন্দের আলো। বর সাজার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন মেধাবী শিক্ষার্থী আরিফ শাহরিয়ার সৌমিক। তাঁর মৃত্যুতে আনন্দের বাড়ি পরিণত হয়েছে শোকের জনপদে।

২১ বছর বয়সী সৌমিকের বাড়ি গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কম্পানিপাড়ায়। সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখা এই তরুণের সামনে ছিল সুন্দর ভবিষ্যৎ, আর জীবনে ছিল নতুন অধ্যায় শুরুর অপেক্ষা। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিণতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই থেমে গেল তাঁর জীবনের পথচলা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সৌমিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, বন্ধু, স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। যে বাড়িতে বিয়ের আনন্দে অতিথিদের আগমন আর হাসি-আনন্দে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন কান্নার রোল। যে তরুণকে বরবেশে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা, তাঁকে শেষবারের মতো দেখার বেদনায় ভেঙে পড়েছেন সবাই।

সৌমিকের পাড়ার বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সৌমিককে চিনি। ছেলেটি ছিল অত্যন্ত বিনয়ী ও অদম্য মেধাবী। বিয়ের ঠিক আগের দিন তার মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। নতুন জীবন শুরু করার মুহূর্তে তাকে হারানোর এই শোক পরিবার কখনোই সামলে উঠতে পারবে কি না, জানি না।’

সৌমিকের একমাত্র বড় বোন শারমিন সুলতানা জানান, এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে এসেছিলেন তাঁর ভাই। গত চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সকাল ৯টার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালের বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়।

শারমিনের অভিযোগ, সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর বেলা ১টার দিকে সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মনির হোসেন মুরাদ ব্যবস্থাপত্র দেন। পরে ওষুধপত্র নিয়ে সৌমিককে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন স্বজনেরা।

কিন্তু বিকেলের দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা রিকশায় বসে ছিলেন সৌমিক। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

একটি পরিবারের কাছে বিয়ের দিনটি হওয়ার কথা ছিল জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন। কনের বাড়িতে ছিল গায়ে হলুদের আয়োজন, বরকে বরণ করতে তৈরি করা হয়েছিল আলোকসজ্জার গেট। অন্যদিকে বরের বাড়িতেও চলছিল নববধূকে ঘরে তোলার প্রস্তুতি। শুক্রবার বিয়ে, আর শনিবার নবদম্পতির বউভাত—সব মিলিয়ে দুই পরিবারে ছিল উৎসবের আমেজ।

কিন্তু সেই আয়োজনের মাঝেই নেমে এলো এমন এক শোক, যার ভার বহন করা কঠিন। যে বাড়ির দরজায় বরবরণের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে এখন প্রিয়জন হারানোর কান্না। যে তরুণের নতুন সংসার গড়ার কথা ছিল, তাঁর জন্যই আজ শোকের মাতম দুই পরিবারে।

বিয়ের সাজসজ্জা আর উৎসবের প্রস্তুতি এখন যেন এক নির্মম বাস্তবতার নীরব সাক্ষী। সৌমিকের অকালমৃত্যুতে শুধু দুটি পরিবার নয়, শোকাহত হয়ে পড়েছে পুরো মহল্লা। আনন্দের যে দিনটি স্মৃতিতে থাকার কথা ছিল হাসি আর ভালোবাসায়, তা চিরদিনের জন্য থেকে গেল এক হৃদয়বিদারক শোকগাথা হয়ে।