কুমিল্লা রেলওয়ে অঞ্চলের ১৮৬ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে অন্তত ১১৬টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। গেইট, গেইটম্যান ও প্রয়োজনীয় সিগন্যালব্যবস্থা না থাকায় এসব ক্রসিং এখন পথচারী ও যানবাহনের জন্য ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে এসব রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৫৩ জন, আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আরও অনেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার মধ্যে মাত্র ২১টি গেইটযুক্ত বৈধ লেভেল ক্রসিং থাকলেও অন্তত ৫৯টি অরক্ষিত ক্রসিংয়ে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে ট্রেনের আগমন সম্পর্কে পূর্বাভাস না থাকায় প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি মার্চ মাসে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বুড়িচংয়ের কালিকাপুর এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশার ৭ যাত্রী নিহত হন। এই দুটি ঘটনাতেই প্রাণ গেছে ১৯ জনের, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্যমতে, লাকসাম-নোয়াখালী রুটের ৪৯ কিলোমিটারে বৈধ ১৯টি ও অবৈধ ৪২টি, লাকসাম-চাঁদপুর রুটের ৫১ কিলোমিটারে বৈধ ২৩টি ও অবৈধ ৩৬টি এবং লাকসাম-আখাউড়া রুটের ৭২ কিলোমিটারে বৈধ ৩৩টি ও অবৈধ ৩৮টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্মিত সড়কের সঙ্গে যুক্ত।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থা রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করায় পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়েছে অরক্ষিত ক্রসিং।
মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পদুয়ার বাজার এলাকার বাসিন্দা রাশেদ বলেন, “দুই বছর ধরে সিগন্যাল লাইট নষ্ট। ট্রেন আসবে কি না বোঝার উপায় নেই।”
অন্যদিকে দোকানদার ইদ্রিস মিয়ার অভিযোগ, “অনেক জায়গায় গেইটম্যান থাকলেও তারা দায়িত্বে অবহেলা করেন, রাতে থাকেন না, এমনকি মাদক সেবনের অভিযোগও আছে।”
লাকসাম রেলওয়ে থানার তথ্যমতে, গত ১০ বছরে নিহতের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৭ সালে ৭৪ জন, ২০১৮ সালে ৬৮, ২০১৯ সালে ৬৬, ২০২০ সালে ৩৭, ২০২১ সালে ৪২, ২০২২ সালে ৪৯, ২০২৩ সালে ৪৫, ২০২৪ সালে ৬৪, ২০২৫ সালে ৭৮ জন এবং চলতি বছরের ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৩০ জন নিহত হয়েছেন।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, “অবৈধ ক্রসিংগুলোতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। অসাবধানতা ও সচেতনতার অভাবও বড় কারণ।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংগুলো দ্রুত বন্ধ বা আধুনিকায়ন, গেইট ও সিগন্যাল স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছাড়া দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান বলেন, “অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে।”
তবে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
নাগরিক সচেতন মহলের দাবি, অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো দ্রুত নিরাপত্তার আওতায় এনে মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নইলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হবে।
