Spread the love

স্বপ্ন ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর। ইউরোপে গিয়ে ভাগ্য বদলের আশায় একে একে বিক্রি করেছিলেন সহায়-সম্বল, জমিজমা। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল মৃত্যুর ফাঁদ। সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের নির্মম বুকে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রাণ হারালেন সুনামগঞ্জের ১০ যুবক।

নিহতদের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন, দিরাইয়ের ৪ জন এবং দোয়ারাবাজারের ১ জন রয়েছেন। তাদের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এখনো প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য না পৌঁছালেও পরিবারগুলোর কান্না আর স্বজনদের আর্তনাদই যেন এই মর্মান্তিক ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

জানা গেছে, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ২৬ জন যাত্রী নিয়ে একটি ছোট নৌকা গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ভাগ্য বদলের আশায় পাড়ি জমানো এই যাত্রা ধীরে ধীরে রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে। প্রতিকূল আবহাওয়া আর দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ায় টানা ৬ দিন ধরে খাবার ও পানীয় ছাড়া সমুদ্রে ভাসতে থাকে নৌকাটি। একে একে নিভে যেতে থাকে প্রাণের আলো। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর ক্লান্তির কাছে হার মানে ২২টি জীবন।

বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভাষ্য, মৃত্যুর পরও শেষ সম্মানটুকু জোটেনি অনেকের ভাগ্যে। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছে মাঝসমুদ্রেই—অপরিসীম নির্মমতায়।

নিহতদের মধ্যে জগন্নাথপুরের আমিনুর রহমান, শায়ক মিয়া, মো. আলী, সোহানুর রহমান ও নাঈম; দিরাইয়ের নুরুজ্জামান সর্দার ময়না, সাহান এহিয়া, সাজিদুর রহমান ও মুজিবুর রহমান; এবং দোয়ারাবাজারের ফাহিম রয়েছেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিজন দালালদের ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমান। কেউ কেউ তিন-চার মাস আগে লিবিয়ায় গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। ‘গেমঘর’ নামক নির্যাতনকেন্দ্রে আটকে রেখে তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক অত্যাচার—খাবার না দিয়ে উপোস রাখা, শারীরিক নির্যাতন—সবই ছিল এই নিষ্ঠুর যাত্রার অংশ।

এ ঘটনায় উঠে এসেছে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের নাম। অভিযোগ রয়েছে, ছাতকের দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লাল এই চক্রের মূল হোতা। বিল্লাল গ্রিসে বসে নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন, আর দেশে দুলাল মিয়া সহজ-সরল যুবকদের স্বপ্ন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন।

এদিকে গ্রিক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি—বাংলাদেশে থাকা মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ সুনামগঞ্জের গ্রামগুলো। মায়ের কান্না, স্ত্রীর হাহাকার আর সন্তানের নিরব চোখের জল—সব মিলিয়ে যেন এক গভীর বেদনার ছবি। যে স্বপ্ন নিয়ে তারা ঘর ছেড়েছিল, সেই স্বপ্নই আজ হয়ে গেছে পরিবারের জন্য এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

By তালাশ বাংলা ডেস্ক

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *