Spread the love

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত গণভোটকে ঘিরে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ, নারী ও তরুণ ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রধান দলগুলোর ফল মেনে নেওয়ার ঘোষণায় নির্বাচনী পরিবেশে ইতিবাচক বার্তা মিলেছে।

ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৮০টিতে জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৫৪টি আসন। এনসিপি ২, গণঅধিকার পরিষদ ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

অন্যদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি ২০২, জামায়াত ৬৪, এনসিপি ৫, গণঅধিকার ২ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন ১২টি আসনে।

৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনে প্রয়োজন ১৫১টি আসন। দুই শতাধিক আসন পেলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দলটি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথম নির্বাচনঃ

এবারই প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনের এক মাস আগে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হবেন।

ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান অল্প ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজ আসনে এগিয়ে রয়েছেন। ঢাকা-১৫ আসনে এগিয়ে আছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। খুলনা-৫ আসনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রাথমিক ফলে পিছিয়ে পড়েছেন।

একমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটের সমীকরণঃ

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ফলাফল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, ভোটার মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এবং সংগঠনগত সক্ষমতার সমন্বিত প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত একমুখী হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধী ভোটকে একত্রিত করেছে, যার বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।

তবে জামায়াতও ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন পাওয়ার পথে রয়েছে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং তৃণমূল সংগঠনের সক্রিয়তার ফল হিসেবে বিশ্লেষকরা এ সাফল্য দেখছেন।

তরুণ ও নারীর সক্রিয় উপস্থিতিঃ

নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তরুণরা দলীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সংখ্যালঘু ভোটাররাও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জয়ী বা নিরাপদ প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন।

ভোটার উপস্থিতি ৬১% ছাড়িয়েছেঃ

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৬১ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। চূড়ান্ত হিসাবে এ হার বাড়তে পারে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার শঙ্কা থাকলেও তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।

বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও জাল ভোটের অভিযোগ থাকলেও বড় ধরনের সহিংসতা হয়নি। এবারই প্রথম নির্বাচনে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এগিয়েঃ

সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হলে এককক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের পথ খুলবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হলো এই নির্বাচন ও গণভোট। সংসদ নির্বাচনে সাদা ব্যালট এবং গণভোটে গোলাপি ব্যালট ব্যবহার করা হয়।

By তালাশ বাংলা ডেস্ক

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *