ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে টানা চার দিনের ছুটিতে রাজধানী ছাড়ছেন লাখো মানুষ। ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগে ঢাকার প্রধান টার্মিনালগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে ঈদের মতো ভিড়।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন, সায়দাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনালে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই নেমেছে মানুষের ঢল, যা মধ্যরাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ভোটারদের গ্রামে ফেরাতে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন প্রার্থী বিনামূল্যে বাস ও লঞ্চ সার্ভিস চালু করেছেন। পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাটি ও পিরোজপুরগামী যাত্রীদের ভিড়ে সদরঘাট ছিল উৎসবমুখর।
সদরঘাটে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি লঞ্চই কোনো না কোনো প্রার্থী বা দলের ব্যানারে রিজার্ভ করা। পটুয়াখালী আসনের জামায়াতে ইসলামী নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরসহ বিএনপির একাধিক নেতা লঞ্চ রিজার্ভ করে বিনামূল্যে যাত্রী পরিবহন করছেন।
সাখাওয়াত হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, “ঈদের সময় যেমন ভিড় হয়, এখনো ঠিক তাই। প্রায় সব লঞ্চই কোনো না কোনো প্রার্থী রিজার্ভ নিয়েছে।”
অপর যাত্রী আব্দুর রহমান জানান, “ছুটি পেয়েও গ্রামে যাব কি না ভাবছিলাম। পরে শুনলাম ফ্রি লঞ্চ চলছে। তখনই পরিবার নিয়ে চলে এসেছি।”
শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের ভিড়েও চাপ বেড়েছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুরগামী ট্রেনে বাড়তি ভিড় দেখা গেছে। বিভিন্ন বগি ভাড়া নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
সায়দাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনালেও একাধিক প্রার্থীর উদ্যোগে ফ্রি বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি দলীয় কর্মীরাও উপকৃত হচ্ছেন।
ভোটের আমেজ থাকলেও যাত্রাপথে দুর্ভোগ কমেনি। সদরঘাটের সংযোগ সড়কে তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে লঞ্চঘাটে পৌঁছাতে হয়েছে অনেককে।
টাঙ্গাইল থেকে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, “বাসে উঠতেই দেরি হয়েছে, ভাড়াও বেশি। তবে লঞ্চে উঠতে পেরে সব ক্লান্তি ভুলে গেছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদ বলেন, “ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু সদরঘাটের বিশৃঙ্খলা দূর না করলে এই ভোগান্তি থেকেই যাবে।”
দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তরুণদের মধ্যে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
সামিউল ইসলাম বলেন, “১৭ বছর ঠিকমতো ভোট দিতে পারিনি। এবার পারবো। আমার কাছে এটা ঈদের মতো লাগছে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা বলেন, “প্রথমবার ভোট দেব। এই উত্তেজনায় কষ্ট কিছুই মনে হচ্ছে না।”
সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল হাই লাঠিতে ভর দিয়ে লঞ্চে উঠতে উঠতে বলেন, “ভোট দেওয়া আমাগো আমানত। শরীর ভালো না, তবুও গ্রামে যাচ্ছি।”
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বড়াই জানান, বিভিন্ন এলাকার প্রার্থীদের উদ্যোগে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
সদরঘাট নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, “সমন্বয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ভোটের টানে ফ্রি বাস-লঞ্চে গ্রামমুখী মানুষের এই স্রোত প্রমাণ করছে—সুযোগ পেলে মানুষ এখনও ভোট ও গণতন্ত্রকে উৎসব হিসেবেই দেখে।
