পাশের ফ্ল্যাটের আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে জোর করে নিজের ঘরে নিয়ে যায় সোহেল রানা। টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করে। রামিসা চিৎকার করলে হত্যা করে। পরে লাশ গুমের পরিকল্পনা থেকে টুকরো করার চেষ্টা করে সোহেল। কিন্তু এরই মধ্যে শিশু রামিসার মা পারভীন আক্তার সন্তানের খুঁজে বাইরে থেকে ডাকাডাকি করলে বাসার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল।
গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে সোহেল রানা। আদালত ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জবানবন্দির বিষয়টি জানা গেছে। সোহেল রানা আদালতে আরও জানায়, লাশ টুকরো টুকরো করলে সহজেই তা গুম করা সম্ভব হবে ভেবে ছুরি দিয়ে রামিসার হাত ও মাথা কেটে আলাদা করে।
এদিকে স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে স্ত্রী স্বপ্না আক্তাদের বিরুদ্ধে। তিনি ধর্ষণের সময় অন্য কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন। দরজায় ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙে তার। কিন্তু এরপর রামিসার লাশ দেখতে পায় এবং স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে।
এর আগে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে হাজতখানা থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওই সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজন তাকে উদ্দেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েকজন সোহেলকে লাথিও মারেন। জনতার হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনেকে বলতে থাকেন। কেউ কেউ তার প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি জানান। এরপর সোহেল রানা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ডের আবেদন করেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান। এ ছাড়া স্বপ্না আক্তারকেও আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে স্বপ্নাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ছাড়া জবানবন্দি শেষে সোহেল রানাকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
সোহেলের জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদনে এসআই অহিদুজ্জামান উল্লেখ করেন, নিহত রামিসা পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রতিবেশী সোহেল রানা তাকে কৌশলে নিজের রুমে নিয়ে যায়। এরপর টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করে। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রতিবেশী সোহেলের বাসার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান মা পারভীন আক্তার। ভেতরে থাকতে পারে—এমন সন্দেহে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা না খোলায় সন্দেহ হয় পারভীনের। চিৎকার-চেঁচামেচিতে আশপাশের লোকজনও ছুটে আসে। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নাকে পাওয়া যায়। আর খোঁজাখুঁজি করে রামিসার মাথাবিহীন শরীর পাওয়া যায় খাটের নিচে। আর মাথা পাওয়া যায় টয়লেটের ভেতরে একটি বালতির মধ্যে। ততক্ষণে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। পরে ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ এসে স্বপ্নাকে আটক করে। পল্লবী থানায় সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে মামলা করেন রামিসার বাবা হান্নান মোল্লা। মঙ্গলবার রাতেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
রামিসা হত্যায় আরও একজন জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে সোহেল রানা। তাকে খুঁজছে পুলিশ। থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা বেশ কয়েকবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। সে দাবি করেছে, শিশু রামিসাকে হত্যা করার সময় তার বাসায় স্ত্রী ছাড়া আরও একজন ছিল। ওই ব্যক্তির নামও বলেছে সোহেল। তবে দুবারে দুজনের নাম বলেছে। পুলিশ তাদের নাম প্রকাশ করেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, সোহেল পেশায় রিকশা মেকানিক। আরও একজন তার সঙ্গে ছিল বলে দাবি করেছে সোহেল। আমরা ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।
অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, আসামি নিজেকে বাঁচানোর জন্য নানা ধরনের তথ্য দিয়েছে। কোনোটা সত্য, কোনোটা মিথ্যা। আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করছি।
ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বিকেল ৩টার দিকে রামিসার মরদেহ নেওয়া হয় পল্লবীর বাসার সামনে। শত শত নারী-পুরুষ জড়ো হয় সেখানে। সবার মধ্যে দেখা গেছে উৎকণ্ঠা, সঙ্গে ক্ষোভ। আট বছরের শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আশপাশের লোকজন। শোকে অন্ধকার হয়ে আছে মানুষের মুখ।
রামিসাকে বহন করা লাশবাহী গাড়িটি বাসার সামনে আসতেই মেয়েকে একনজর দেখার জন্য এগিয়ে যান বাবা হান্নান মোল্লা। কিন্তু সহ্য করতে পারেননি। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যান। কয়েকজন ধরে তাকে বাসাটির নিচতলায় নিয়ে যান। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর জ্ঞান ফিরে তার।
এদিকে তিনতলায় রামিসার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসায় রামিসার বড় বোন রাইসা ও মা পারভীন আক্তারকে ঘিরে আছেন স্বজনরা। কিছুক্ষণ পরপর ডুকরে কাঁদছেন পারভীন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, আমার মেয়ে নিচে কেন? ওকে উপরে আনো। আমার বুকে এনে দাও। আমার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। আমার কলিজার ধনকে এনে দাও।মায়ের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন রাইসা। কিছুতেই মানতে পারছেন না বোনের এমন নির্মম মৃত্যু।
রামিসার মরদেহ বাসার সামনে আনার পর নারীদের একটি গ্রুপ প্রতিবাদ মিছিল করে। ‘ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্স’ ব্যানারে নারীরা প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতে ছিল—প্রশাসন ও সমাজ এক হোক, যৌন নির্যাতন চিরতরে শেষ হোক; রামিসা হত্যার বিচার চাই, শিশু হত্যার অবসান চাই; ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ কর। নিরাপদ সমাজ গড়; আর কত মৃত্যু হলে যৌন নির্যাতন বন্ধ হবে?
রামিসাকে একনজর দেখতে কাজীপাড়া থেকে আসেন জান্নাত আরা নামে এক নারী। তিনি বলেন, গতকালকে খবরে দেখে খুব খারাপ লাগছিল। মেয়েটার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কী সান্ত্বনা দেব? আমারও একটা মেয়ে আছে। ভেবেই খুব কষ্ট হচ্ছে। এমন নির্মম হত্যার বিচার চাই।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় উপস্থিত অনেককে। ভিড়ের মধ্য থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, দেশে বিচার ঠিকঠাক হয় না বলে পশুগুলো এত সাহস পায়। কঠিন শাস্তি দেওয়া দরকার।
পল্লবীতে রামিসার প্রথম জানাজা হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে। সেখানে এশার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
